হাসানের বয়স মাত্র এগারো বছর। ও চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। বেশ চঞ্চল ও সাহসী ছেলে ও। তবে হাসান ইদানিং একটু বেশিই আনন্দিত। কেননা ও এবার প্রথম বারের মত গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করবে। গ্রামের আঁকাবাকা মেঠোপথ দিয়ে উদাস বেশে হেটে বেড়াবে। গ্রামের পুকুরে নেমে গ্রামের দস্যি ছেলেদের সাথে করবে স্নান। গ্রামের ছেলেদের সাথে মেতে উঠবে বউছি, কাণামাছি ইত্যাদি গ্রাম্য খেলায়।
ভাবতে ভাবতে প্রতিক্ষীত সেই সময় এসেই পড়লো। আজ হাসান ওর বাবা-মা, বড় ভাই-বোন সবাই মিলে ঢাকার বাড়ী ছেড়ে রওয়না দিবে গ্রামের বাড়ীর দিকে। ওরা ঈদের আগেরদিন গিয়ে পৌছল ওদের গ্রামের বাড়ীতে। যেখানে ওর দাদা-দাদী ও এক কাকা বাস করে।
ওরা যখন পৌছলো বাড়ীতে, তখন সন্ধ্যা নামতে বেশ কিছু সময় বাকি। হাসান কৌতুহল নিয়ন্ত্রন করতে পারলনা। কাপড় ছেড়ে, ফ্রেশ হয়ে ও চলে গেল গাঁয়ের মেঠো পথ ধরে হাটতে হাটতে গ্রামের একটি মাঠে। কাছাকাছি গিয়ে ও লক্ষ্য করলো, ওর বয়সী কয়েকজন ছেলে ফুটবর খেলছে। কয়েকজন মাঠের চারপাশে বসে খেলা প্রদক্ষিন করছে। একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে ওর দৃষ্টি সেখানে আটকে গেল। জীর্ণশীর্ণ কাপড় পড়ে, মাঠের এক পাশে চুপটি মেরে বসে আছে। অন্যদের মত ওর চোখে নেই আনন্দের লেশ, নেই কোন উচ্ছাস, নেই চঞ্চলতা। কেমন যেন নির্জীব হয়ে আছে ছেলেটা। বেঁচে থেকেও ঠিক মরার মত। ওর ইচ্ছে করছিল কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে, কেন এভাবে বসে আছে। কিন্তু সাহস করে উঠলনা। কি বলবে, কি ভাববে ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে গোধূলী পেড়িয়ে নেমে এলো সন্ধ্যা। ওর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মন খারাপ করেই চলে এলো বাড়ীতে। ও ঠিকমত পারলনা রাতে খেতে, পারলনা ভাল ঘুমাতে। সব সময় একটাই চিন্তা ওর মাথায়, ছেলেটার এমন কি হয়েছে যে, ও এভাবে মনমরা করে বসে আছে। ভাবতে ভাবতে রাত পোহাল। এলো স্নিগ্ধ সকাল। ঘুম ভাঙ্গতে আবার মনে পড়ে গেল ঐ ছেলেটার কথা।
গোসল সেরে সবাই যখন ঈদগাহ এর দিকে রওয়ানা দিয়েছে, তখন হাসান ঈদ গাহ এর দিকে না গিয়ে লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করতে করতে ঐ ছেলেটার বাড়ীতে গিয়ে উঠল। বাড়ীর বাইরে থেকে হৈ চৈ এর আওয়াজ আসছিল। এক মহিলা উচ্চকন্ঠে কাউকে বলছে “কান্দস ক্যা, কোথাও গিয়া মরা পারসনা। ঘরে খাবার কিছু নাই, তারে নতুন জামা কিনা দাও” এ কথা শুনে, ছেলেটার মন খারাপের বিষয়টা পুরোপুরি বুঝতে পারল হাসান।
হাসান বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ না করে চলে গেল ওদের নিজেদের বাড়ীতে। খুব দ্রুত গতিতে গিয়ে আবার ফিরে এল হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে। প্যাকেটটা ঐ ছেলের হাতে দিয়ে বল্লো “নাও এটা পরে নাও” তুমি কে? ছেলেটার সরাসরি প্রশ্ন। আমি তোমাদের এলাকারই ছেলে। থাকি ঢাকায়। আচ্ছা, তুমি কি নাজমুল সাহেবকে চিন? আমি তার নাতি। চল জলদি করে জামাটা পড়ে নাও। আমরা এক সাথে ঈদগাহে যাব। আচ্ছা, তোমার নাম কি? আল আমিন। তোমার নাম কি? আমি হাসান। তুমি কি আমার বন্ধু হবে? হাসানের প্রশ্ন। আল আমিন বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে হাসানের দিকে। এক সময় চোখে জল এসে যায় ওর। যাই হোক ওরা এক সাথে মাঠে গিয়ে নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে শুরু হয় কুলাকুলি। ওরাও পরস্পর কুলাকুলি করে। অতপর হাসান আল আমিনকে সাথে নিয়ে চলে আসে ওদের বাড়ীতে।
হাসান আল আমিনকে মিষ্টি মুখ করায় নিজেও মিষ্টি মুখ করে। সেই সাথে অন্যান্য খাবারও পরিবেশন করে। এ সময় হাসানের মা লক্ষ্য করে আল আমিনের গায়ে হাসানের পোশাক। মনে মনে তিনি খুব বিরক্ত বোধ করলেও কিছু না বলে চুপ করে থাকেন। খাওয়া দাওয়া শেষে যখন আল আমিন হাসানদের বাড়ী থেকে বিদায় নেয়। তখন হাসানের মা হাসানকে লক্ষ্য করে বলেন “ঐ জামাটাতো তোমার, ওর গায়ে গেল কি করে” হাসান খানিকটা সময় মাথা নিচু করে থেকে আসতে আসতে বলতে আরম্ভ করে “দেখ মা! ওরা খুব গরীব, ঈদে ওর বাবা ওকে জামা কিনে দিতে পারেনি। আর আমারতো অনেক জামা। তাই আমি ওকে একটি জামা উপহার দিয়েছি” হাসানের বাবা দাড়ানো ছিল পাশে। ছোট ছেলের মুখে এমন কথা শুনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেননা। ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন, আর বলতে লাগলেন “আমার ছেলে বড় হয়ে গেছ” বলতে বলতে কখন যে, দু'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে বুঝতেও পারেননি।